গ্রামের নাম বসন্তপুর। ছোট্ট, শান্ত একটি গ্রাম। কাঁচা রাস্তার দুপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত, মাঝখানে মানুষের সহজ সরল জীবন। এই গ্রামেই বড় হয়েছে দুই বন্ধু, শরিফ আর শামিম গাজী। ছোটবেলা থেকেই তারা ছিল অবিচ্ছেদ্য। একসাথে স্কুলে যাওয়া, বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলা, আর ঈদের দিন নতুন জামা পরে বন্ধুদের সাথে বাড়ি বাড়ি ঘোরা, সবকিছুই ছিল তাদের একসাথে।
কিন্তু সময় সবকিছু বদলে দেয়।
অল্প বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সংসারের অভাব, বাবা-মায়ের কষ্ট আর ছোট ভাই-বোনদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে একদিন তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিদেশে যাবে। স্বপ্ন খুব বড় ছিল না; শুধু চেয়েছিল পরিবারের মুখে একটু স্বস্তির হাসি ফুটুক।
সেদিন গ্রামের ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডে বিদায়ের মুহূর্তটা ছিল খুব নীরব। শরিফের মা চোখ মুছতে মুছতে বলেছিলেন, -বাবা, টাকা না পাঠালেও চলবে… মাঝে মাঝে বাড়ি আসবি।"
শামিমের ছোট বোন তখন কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলেছিল, -ভাইয়া, ঈদের সময় অবশ্যই আসবা, ঠিক আছে?
দুই বন্ধু তখন শুধু মাথা নেড়ে হেসেছিল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল অজানা কষ্ট আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ।
তারপর কেটে গেছে কয়েক বছর।
এখন শরিফ আর শামিম গাজী থাকে দূর দেশের এক ব্যস্ত শহরে। ভোর থেকে শুরু হয় কাজের ব্যস্ততা। দিনের পর দিন শ্রম, ক্লান্তি আর নিরন্তর দায়িত্বের চাপে জীবন যেন এক যান্ত্রিক ছন্দে বাঁধা পড়ে গেছে। রাতে কাজ শেষে ছোট্ট একটি রুমে ফিরে আসে তারা। সেই রুমেই রান্না, ঘুম আর গল্প, সবকিছু।
ঈদ সামনে এলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায় তাদের।
গ্রামে তখন ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বাজারে নতুন জামার ভিড়, বাড়িতে সেমাই আর পিঠা তৈরির ব্যস্ততা, উঠোনে নতুন রঙের ছোঁয়া। সব মিলিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
কিন্তু সেই আনন্দ থেকে অনেক দূরে শরিফ আর শামিম।
সেদিন রাতে কাজ শেষে তারা দুজন রুমের ছোট্ট বারান্দায় বসেছিল। দূরের শহরের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু তাদের চোখে ভাসছিল নিজের গ্রামের ছবি।
শরিফ ধীরে বলল, -দোস্ত, মনে আছে ছোটবেলায় ঈদের সকালে আমরা কত দৌড়াদৌড়ি করতাম?
শামিম মৃদু হেসে বলল, "হ্যাঁ… নামাজ পড়ে এসে সরাসরি তোর বাড়িতে যেতাম। খালাম্মা সেমাই না খাইয়ে ছাড়তেন না।"
কথা বলতে বলতে হঠাৎ দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
কারণ এবারও ঈদে বাড়ি ফেরা হবে না।
ছুটির অনুমতি মেলেনি। টিকিটের দামও অনেক বেশি। তাছাড়া দেশে গেলে কয়েক মাসের আয় বন্ধ হয়ে যাবে! যেটা তাদের পরিবারের জন্য বড় ক্ষতি।
শরিফ ফোন বের করে মায়ের নম্বরে কল দিল।
ওপাশ থেকে মায়ের স্নেহভরা কণ্ঠ ভেসে এলো,
"কেমন আছিস বাবা?"
শরিফ একটু থেমে বলল,
"ভালো আছি মা… তুমি?"
মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বললেন,
"ভালোই আছি। ঈদে আসবি না?"
প্রশ্নটা শুনে শরিফের বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। তবুও শান্ত গলায় বলল,
"এইবার হয়তো পারবো না মা… কাজের চাপ।"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মা বললেন,
"ঠিক আছে বাবা। নিজের খেয়াল রাখিস।"
ফোন কেটে যাওয়ার পরও শরিফ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। সে বুঝতে পারছিল! মায়ের কণ্ঠে লুকিয়ে আছে না বলা অসংখ্য অপেক্ষা।
এদিকে শামিম নিজের ফোনে গ্রামের ছবি দেখছিল। ছোট বোনের পাঠানো ছবিতে দেখা যাচ্ছে! বাড়ির উঠোন পরিষ্কার করা হয়েছে, নতুন রঙ দেওয়া হয়েছে দরজায়। ঈদের জন্য ঘর সাজানো হচ্ছে।
শামিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"দোস্ত, আমরা কি সত্যিই ভালো আছি?"
শরিফ একটু হেসে বলল,
"জানি না… তবে পরিবারের জন্য যা করছি, সেটাই হয়তো আমাদের সুখ।"
ঈদের দিন সকালে তারা বিদেশের এক ছোট্ট মসজিদে নামাজ পড়তে গেল। চারপাশে অনেক প্রবাসী মানুষ! সবাই যেন একই গল্পের মানুষ। কারো পরিবার দূরে, কারো মা-বাবা অপেক্ষা করছে দেশের বাড়িতে।
নামাজ শেষে সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঈদের শুভেচ্ছা জানাল।
কিন্তু শরিফ আর শামিমের চোখে তখন ভেসে উঠছিল তাদের গ্রামের সেই ছোট্ট ঈদ! মায়ের রান্না, বাবার হাসি, আর ভাই-বোনদের কোলাহল।
সেদিন বিকেলে তারা দুজন রুমে বসে চুপচাপ সেমাই খাচ্ছিল।
হঠাৎ শামিম বলল,
"একদিন না একদিন আমরা ফিরবো দোস্ত। স্থায়ীভাবে।"
শরিফ জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে বলল,
-"হ্যাঁ… সেই দিনটাই হবে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঈদ।"
দূরের শহরের আকাশে তখন সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল।
আর হাজার মাইল দূরে বসন্তপুর গ্রামের ছোট্ট বাড়িগুলোতে তখন ঈদের আলো জ্বলছিল। সেই আলোয় ভিজে আছে দুই মায়ের দীর্ঘ অপেক্ষা! তাদের প্রিয় ছেলেরা একদিন ফিরবে, ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আবার ডাকবে "মা"।
ঈদের আনন্দের ভিড়ের মাঝেও তাই কোথাও একটা নীরব শূন্যতা রয়ে যায়। কারণ কিছু অপেক্ষা থাকে, যা কোনো উৎসবের কোলাহলেও মুছে যায় না।
তবুও মায়েরা আশা ছাড়েন না। তারা জানেন! একদিন না একদিন সেই পথ ধরেই তাদের ছেলেরা ফিরবে, ক্লান্ত পা নিয়ে হলেও।
আর সেদিনই সত্যিকারের ঈদ হবে বসন্তপুরের সেই ছোট্ট বাড়িগুলোতে।