কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি
মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ কেটে এখন জলাশয়ে চলছে পাট জাগ দেওয়ার ধুম। বাতাসে ভাসছে কাঁচা পাটের তীব্র গন্ধ। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই কৃষকদের। তবে এই দৃষ্টিনন্দন সোনালি আঁশের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনি, রক্ত আর ঘামের না বলা গল্প। তীব্র দাবদাহে বীজ বোনা থেকে শুরু করে আষাঢ়-শ্রাবণের হাঁটু সমান কাদা-পানিতে দাঁড়িয়ে পাট কাটা, ধোয়া এবং রোদে শুকানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে রয়েছে কৃষকের চরম আত্মত্যাগ। চলতি মৌসুমে ভেড়ামারা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, নদী, খাল ও ডোবাগুলোতে কৃষকেরা পরিবারসহ পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে এত কষ্টের পরও কৃষকদের মুখে পুরোপুরি হাসির ঝিলিক নেই। তাদের চোখে-মুখে এখন কেবলই ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার এক অদৃশ্য আতঙ্ক। উপজেলার ধরমপুর ইউনিয়নের প্রবীণ পাট চাষি রবিউল জানান, পাট চাষ করা এখন এক চরম জুয়া খেলার মতো হয়ে গেছে। আষাঢ়ের কড়া রোদে পুড়ে আর জোঁকের কামড় সহ্য করে নদী-নালায় নেমে পাট ধুতে হয়। শরীর শেষ হয়ে যায়, কিন্তু বাজারে গেলে পাটের সঠিক দাম পাওয়া যায় না। সোনালি আঁশ আমাদের গৌরব ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে এই আঁশ আমাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষ, কাটা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানো পর্যন্ত যে পরিমাণ খরচ হয়, বর্তমান বাজারে পাটের দাম তার তুলনায় অনেক কম।
সার, বীজ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের চড়া মূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে। অথচ বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ কৃষকেরা সরাসরি লাভবান হতে পারছেন না। ভেড়ামারা উপজেলার উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা নীলাম্বর বসাক বলেন, এবার উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভালো পাটের আবাদ হয়েছে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও সন্তোষজনক। তবে পানি সংকটের কারণে অনেক জায়গায় পাট জাগ দিতে কৃষকদের কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। ভেড়ামারা উপজেলার পাট ব্যবসায়ী আজিজুল হক মনে করেন, সোনালি আঁশের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সর্বপ্রথম কৃষকের ঘামের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পাট কেনা, পাট ক্রয়ের নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ এবং ভেড়ামারার স্থানীয় বাজারগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা জরুরি।
তা না হলে লোকসানের মুখে পড়ে আগামীতে কৃষকেরা এই অর্থকরী ফসল চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা হবে। সোনালি আঁশ শুধু বাংলাদেশের গৌরব নয়, এটি ভেড়ামারার হাজারো কৃষকের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। তাই এই শিল্পের পুনরুজ্জীবনে এবং কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সম্পাদকঃ মোঃ ইমরুল হক, প্রকাশকঃ মোঃ আরমান হোসেন, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ২৭/বি ১ম কলোনি, মাজার রোড় মিরপুর -১ ঢাকা ১২১৬, সম্পাদকঃ ০১৯১০৬৩৭৩২১, প্রকাশকঃ ০১৮৭২৬০৫৩৬২, Email: sottoprokash8643@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক সত্য প্রকাশ. All rights reserved.