নিজস্ব প্রতিবেদক
গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর এলাকায় নীরবে বিস্তার লাভ করছে অনলাইন ক্যাসিনো ও বেটিংয়ের অবৈধ কার্যক্রম—এমন অভিযোগ উঠেছে। স্মার্টফোন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু চক্র অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, তরুণ ও কর্মজীবী যুবকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাশিমপুরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা, বাজার, চায়ের দোকান, সেলুন ও আড্ডাকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গোপনে অনলাইন বেটিং সাইটের আইডি খুলে দেওয়া, অর্থ জমা ও উত্তোলনে সহায়তা এবং নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহের কাজ চলছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া স্থানীয়দের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ উঠেছে, অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি মাদকদ্রব্যের অবৈধ কেনাবেচার সঙ্গেও জড়িত। একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তরুণদের জুয়া ও মাদকের দিকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পশ্চিম শৈলডুবি এলাকার কাইয়ুম নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অনলাইন বেটিং পরিচালনা ও মাদক বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কাশিমপুরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাগবাড়িতে ইউনিমাস স্পোর্টস ওয়্যার লিমিটেড কারখানার পাশের এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি অনলাইন জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে বিপ্লব ও সোহেলের নাম স্থানীয়দের অভিযোগে এসেছে। চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে বসে তারা অনলাইন বেটিংয়ে নতুন খেলোয়াড় যুক্ত করছেন এবং অর্থ লেনদেনে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে সারদাগঞ্জ এলাকার ডিবিএল গ্রুপের জিন্নাত অ্যাপারেলস লিমিটেডে কর্মরত বাদশা মিয়া, বারেন্ডা এলাকার রবিন, গোবিন্দবাড়ী এলাকার মন্ডল গ্রুপের কটন বিডি লিমিটেডে কর্মরত মিলন এবং কাশিমপুরের কাজী মার্কেট এলাকার কয়েকটি সেলুনে কর্মরত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অনলাইন বেটিংয়ের আইডি খোলা, নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনে সহায়তার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এছাড়া সুরাবাড়ী, বারেন্ডা, নয়াপাড়া, এনায়েতপুর, মাধবপুর, পানিশাইল, জিরানী ও সারদাগঞ্জ এলাকা মিলিয়ে কাশিমপুরেই প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি এজেন্ট ও সাব-এজেন্ট হিসেবে জুয়ার সাথে জড়িত রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। আর এদের গ্রাহক হিসেবে জুয়ারি হয়ে জুয়ায় বুদ হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলো সাধারণত মোবাইল ব্যাংকিং ও অন্যান্য ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে লেনদেন করে থাকে। খেলোয়াড়রা নির্দিষ্ট নম্বরে টাকা পাঠানোর পর তাদের অনলাইন অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স যোগ করা হয়। পরে জিতলে একই বা অন্য নম্বরের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহারের কারণে এসব কার্যক্রমের প্রকৃত নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রথমে অল্প টাকায় খেলতে উৎসাহিত করা হলেও ধীরে ধীরে অনেকেই বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর ফলে পরিবারে অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় অনীহা এবং কর্মক্ষেত্রে অমনোযোগের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনলাইন জুয়া আচরণগত আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। একবার লাভের অভিজ্ঞতা হলে পুনরায় খেলার প্রবণতা তৈরি হয় এবং ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় কেউ কেউ আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকেন। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের আসক্তি মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের অভিযানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে বহু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, এমএফএস-সংশ্লিষ্ট সিম, নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও এসব কার্যক্রমের সঙ্গে অবৈধ অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও তদন্তে উঠে এসেছে।
গাজীপুরেও বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। ফলে কাশিমপুর এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—তা খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কাশিমপুরে কারা অনলাইন জুয়ার আইডি খুলে দিচ্ছে, কারা নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করছে, কীভাবে অর্থ লেনদেন হচ্ছে এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ লেনদেনে ব্যবহৃত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট ও সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল লেনদেন শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে তরুণদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সন্দেহজনক কার্যক্রমের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো এবং ডিজিটাল অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়েছে।
সম্পাদকঃ মোঃ ইমরুল হক, প্রকাশকঃ মোঃ আরমান হোসেন, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ২৭/বি ১ম কলোনি, মাজার রোড় মিরপুর -১ ঢাকা ১২১৬, সম্পাদকঃ ০১৯১০৬৩৭৩২১, প্রকাশকঃ ০১৮৭২৬০৫৩৬২, Email: sottoprokash8643@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক সত্য প্রকাশ. All rights reserved.