সত্য প্রকাশ ডেস্ক
মধুমতী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান—কিছুদিন আগেও এমন দৃশ্যই ছিল মহম্মদপুরে। ড্রেজারের পাইপ কেটে ধ্বংস করা হয়েছিল।
ডাম্পিং ইয়ার্ডে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছিল।
বন্ধ হয়েছিল বালু উত্তোলন, ডাম্পিং ও বেচাকেনা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আবারও সেই মধুমতীতেই শুরু হয়েছে বালু উত্তোলন।
প্রশ্ন উঠছে—কার ছত্রছায়ায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই বালু ব্যবসা?
চার মাস আগের কথা। মহম্মদপুরে একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এই উপজেলার কৃতি সন্তান তিনি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মহম্মদপুর উপজেলার সীমানায় মধুমতী নদী থেকে বালু উত্তোলন, অপসারণ, ডাম্পিং, ক্রয়-বিক্রয় বন্ধে প্রশাসন ও পুলিশকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রচারও হয়েছিল।
নির্দেশনা মোতাবেক তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহানুর জামান বালু উত্তোলন ও ডাম্পিং বন্ধে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত বেশ কয়েক ড্রেজারের পাইপ ধ্বংস করা হয়।
কয়েকটি ডাম্পিং ইয়ার্ডের মালিককে করা হয় অর্থদণ্ড।
এরপর দীর্ঘ সময় মহম্মদপুরে বন্ধ ছিল মধুমতী নদীর বালু উত্তোলন, ডাম্পিং ও বেচাকেনা।
কিন্তু সম্প্রতি বদলে গেছে সেই চিত্র।
মহম্মদপুরে আবারও মধুমতী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে মধুমতী ব্রিজের উত্তর পাশে জাঙ্গালিয়া এলাকায় ডাম্পিং করে বিক্রি করা হচ্ছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে জায়গা ভরাটেরও অভিযোগও রয়েছে।
নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে শুধু পরিবেশ নয়, জনজীবন নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মধুমতী নদীর তলদেশ থেকে যত্রতত্র বালু উত্তোলন করা হলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে ডাম্পিং করা বালু ভারী যানবাহনে পরিবহনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক।বালুবাহী যান চলাচলের কারণে নিয়মিত দুর্ঘটনাও ঘটছে।
অভিযোগ রয়েছে, বালু পরিবহনে ব্যবহৃত কিছু যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও রোড পারমিট নেই এবং কিছু চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহম্মদপুর বেদবতী মিস্ত্রী বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়ে জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মাহবুবুল আলম মুঠো ফোনে জানান, মহম্মদপুর উপজেলায় বর্তমানে কোনো বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়নি। এমনকি বালু ডাম্পিংয়ের জন্যও কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
যদি এই তথ্য সঠিক হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—কোন অনুমতিতে মধুমতী নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে?কিভাবে জাঙ্গালিয়া এলাকায় বালু ডাম্পিং করা হচ্ছে? কার অনুমতিতে সেই বালু ক্রয়-বিক্রয় চলছে? আরও বিস্ময়ের বিষয়, অভিযোগিত বালু উত্তোলন ও ডাম্পিংয়ের স্থান উপজেলা পরিষদ থেকে মাত্র কয়েকশ মিটারের মধ্যে। এত কাছাকাছি এলাকায় যদি দিনের পর দিন বালু উত্তোলন ও ডাম্পিং হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসনের নজরে বিষয়টি কেন আসছে না—
প্রশ্ন উঠেছে, অবৈধ বালু ব্যবসা বন্ধে প্রশাসন কি আগের মতো কঠোর হবে, নাকি কোনো বিশেষ মহলের প্রভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে? খোঁজ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আরও একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কয়েকজন বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত—এমন দাবি করছেন স্থানীয়রা। তবে রাজনৈতিক পরিচয় অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নয়। তাই প্রশ্নটি রাজনৈতিক পরিচয়ের নয়। প্রশ্ন হলো—বালু উত্তোলনের বৈধ অনুমতি আছে কি না? ডাম্পিংয়ের অনুমোদন আছে কি না? বালু বিক্রির আইনগত ভিত্তি কী? আর যদি অনুমতি না থাকে— তাহলে প্রশাসনের চোখের সামনে কীভাবে চলছে এই কার্যক্রম?
চার মাস আগে যে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে ড্রেজারের পাইপ ধ্বংস করা হয়েছিল, আজ সেই একই মধুমতীতে আবারও বালু উত্তোলনের অভিযোগ।
তাহলে কি আগের অভিযান ছিল শুধুই সাময়িক?নাকি বিশেষ কোন মহলকে সুবিধা দিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল? নাকি প্রশাসনের নজর এড়িয়ে নতুন করে গড়ে উঠেছে বালু ব্যবসার সিন্ডিকেট? আর যদি সত্যিই কোনো অনুমোদন না থাকে—তাহলে কার শক্তিতে চলছে এই বালু উত্তোলন ও ডাম্পিং?
মধুমতী শুধু একটি নদীর নাম নয়—এই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহম্মদপুরের মানুষের জীবন, কৃষি, যোগাযোগ ও পরিবেশ। তাই নদী রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত।
সম্পাদকঃ মোঃ ইমরুল হক, প্রকাশকঃ মোঃ আরমান হোসেন, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ২৭/বি ১ম কলোনি, মাজার রোড় মিরপুর -১ ঢাকা ১২১৬, Email: sottoprokash8643@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক সত্য প্রকাশ. All rights reserved.