
মহম্মদপুরে প্রশাসনকে রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের বাইরে রাখুন
একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর মনোনীত ব্যক্তিও নন। তাঁর দায়িত্ব হলো আইন, বিধি ও সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং উপজেলার সব নাগরিককে সমানভাবে সরকারি সেবা নিশ্চিত করা।

কিন্তু মহম্মদপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে। ফ্যামিলি কার্ডের শুমারির জন্য জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অপসারণের দাবিতে স্লোগান দেওয়ার ঘটনা প্রশাসন ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে—এটাই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচি, দলীয় গ্রুপিং কিংবা পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে একজন কর্মকর্তাকে অপসারণের দাবি তোলা কোনো সুস্থ প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিচায়ক নয়।
মহম্মদপুরে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির অভ্যন্তরে একাধিক রাজনৈতিক বলয়ের অস্তিত্বের কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই বিভাজন যখন সরকারি দপ্তরের সিদ্ধান্ত, কর্মকর্তা নিয়োগ বা প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, তখন তা আর দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ওপর এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।

একজন ইউএনওকে যদি প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবতে হয়—কোন সিদ্ধান্তে কোন রাজনৈতিক গ্রুপ অসন্তুষ্ট হবে—তাহলে তাঁর পক্ষে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে। আবার কোনো কর্মকর্তা আইনানুগভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়লে ভবিষ্যতে অন্য কর্মকর্তারাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারেন। এটি প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা।
আমরা মনে করি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা; দুর্বল করা নয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা ‘কার লোক’—এই প্রশ্নের চেয়ে তিনি আইন অনুযায়ী কাজ করছেন কি না, সেটিই হওয়া উচিত বিবেচনার বিষয়।
মহম্মদপুরে যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তার তদন্ত হোক। যদি কোনো পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকে, তার প্রমাণ যাচাই করা হোক। যদি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিক। কিন্তু কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি যেন রাজনৈতিক মিছিল, স্লোগান কিংবা গ্রুপিংয়ের শক্তির ভিত্তিতে না হয়।

একইভাবে প্রশাসনের প্রতিও আমাদের প্রত্যাশা—কোনো রাজনৈতিক পক্ষের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইন ও বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা যেমন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা জরুরি, তেমনি প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মহম্মদপুরের মানুষ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি হতে চায় না। তারা চায় উন্নয়ন, নিরাপত্তা, নাগরিক সেবা এবং ন্যায়সংগত প্রশাসন। রাজনৈতিক নেতাদের মনে রাখতে হবে—গ্রুপিংয়ের সাময়িক বিজয় হয়তো কোনো ব্যক্তিকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হয় পুরো জনপদকে।
তাই সময় এসেছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঠ আর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মাঠকে স্পষ্টভাবে আলাদা করার।
@ইউএনও কোনো দলের লোক নন—তিনি রাষ্ট্রের কর্মকর্তা।
তাঁকে আইন অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আর কোনো অভিযোগ থাকলে তার সমাধান হতে হবে তদন্ত, প্রমাণ, জবাবদিহি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে নয়।
মহম্মদপুরের স্বার্থে এই নীতিটুকু মেনে চলা এখন শুধু প্রয়োজন নয়, অপরিহার্য।