
নিজস্ব প্রতিবেদক
গাজীপুরের কাশিমপুরে সরকারি ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রমে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চাল ও আটা বিতরণে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন, নির্ধারিত পণ্য কম দেওয়া, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং পণ্য গোপনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর থানাধীন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বারেন্ডা এলাকায় পরিচালিত একটি ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্রে সরেজমিনে এসব অনিয়মের চিত্র দেখা যায়। কেন্দ্রটি পরিচালনা করছেন ডিলার মোসাঃ শাহনাজ বেগম।
সকাল ১১টাতেও শুরু হয়নি বিক্রি
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ৯টা থেকেই নারী-পুরুষ মিলিয়ে অন্তত ১২০ জন ভোক্তা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও সকাল ১১টা পর্যন্ত বিক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সকাল প্রায় ১১টার দিকে একটি ট্রাকে করে চাল ও আটা কেন্দ্রে আসে। বস্তা নামিয়ে ট্রাকটি দ্রুত অন্যত্র চলে যায়।
এ সময় বিতরণ কক্ষে প্রবেশ করে সাংবাদিকরা দেখতে পান—
৫০ কেজির ১৫ বস্তা আটা (৭৫০ কেজি) এবং ৩০ কেজির ১৯ বস্তা চাল (৫৭০ কেজি)। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে বিতরণ কাজের দায়িত্বে থাকা মাস্টার রোমানসহ সংশ্লিষ্টরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে ট্রাকটি পুনরায় কেন্দ্রে ফিরে এসে আরও ৫ বস্তা আটা (২৫০ কেজি) ও ১৪ বস্তা চাল (৪২০ কেজি) নামিয়ে দেয়। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মাস্টার রোমান বলেন,
“হিসাবে একটু গড়মিল হয়েছিল, তাই ট্রাক ফেরত এনে বাকি পণ্য নামানো হয়েছে।
নিয়মিত ১ টন পণ্য না আসার অভিযোগ
স্থানীয় ভোক্তাদের অভিযোগ, এ কেন্দ্রে কখনোই বরাদ্দ অনুযায়ী ১ টন চাল ও ১ টন আটা সরবরাহ করা হয় না। পণ্যের একটি বড় অংশ গোপনে অন্যত্র বিক্রি বা সরিয়ে ফেলা হয়। তবে পণ্য না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক ভোক্তা প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
কয়েকজন ভোক্তা অভিযোগ করে জানান, এখানে কাউকে শুধু ৫ কেজি আটা বা ৫ কেজি চাল দেওয়া হয়, কিন্তু একই ব্যক্তিকে দুই ধরনের পণ্য দেওয়া হয় না। অথচ কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে তাদের ১৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত পণ্য দেওয়া হয়।
এছাড়া ডিলারের লোকজন নিয়মিত ভোক্তাদের সঙ্গে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলেন এবং পণ্য না দেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
নীতিমালার তোয়াক্কা নেই
খাদ্য অধিদপ্তরের ওএমএস নীতিমালা অনুযায়ী বিক্রয় কেন্দ্রের বাইরে ৬×৩ ফুটের লাল রঙের ব্যানার টানানো বাধ্যতামূলক, যেখানে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের নম্বর, ডিলারের নম্বর এবং অভিযোগ জানাতে ১৬১৫৫ ও ৩৩৩ নম্বর উল্লেখ থাকার কথা।
কিন্তু ওই কেন্দ্রে এমন কোনো ব্যানার চোখে পড়েনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পরে তড়িঘড়ি করে একটি ব্যানার টানানো হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় কোনো নম্বর উল্লেখ ছিল না—যা নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
সন্ধ্যার পর বস্তা বস্তা পণ্য সরানোর অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিক্রয় কেন্দ্রের পাশের এক বাসিন্দা জানান, দুপুরের পর পণ্য শেষ বলে কেন্দ্র বন্ধ করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে লোক না থাকলে রিকশাযোগে বস্তায় বস্তায় চাল ও আটা অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এতে মাস্টার রোমান ও স্থানীয় আকলিমা সহযোগিতা করেন।
ডিলার ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য
এ বিষয়ে ডিলার মোসাঃ শাহনাজ বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“আমি লটারির মাধ্যমে ডিলার হয়েছি ঠিকই, কিন্তু এসব বিষয় আমি জানি না। তাই কোনো মন্তব্য করতে পারবো না।”
পরে তিনি ফোনে এক ব্যক্তিকে ধরিয়ে দেন, যিনি নিজেকে মানবাধিকার কর্মী পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের বিক্রয় কেন্দ্রে যাওয়া এবং ডিলারকে ফোন করা ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য নানাভাবে হুমকিও দেন।
তদারকি কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা
অভিযোগ রয়েছে, বিক্রয় কেন্দ্রটির তদারকি কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার নিয়ম অনুযায়ী বিক্রয় শুরুর সময় উপস্থিত থাকেন না। এ বিষয়ে তিনি ফোনে বলেন,
“অফিশিয়াল কাজে ব্যস্ত থাকি, তাই নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
তবে দায়িত্বে অবহেলা কেন—এমন প্রশ্ন করতেই তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরে আর ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শফি আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
(পর্ব-০১)