
কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা নদীতে অবৈধভাবে ফিলিং বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক গোলাগুলি, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১ মার্চ) দিবাগত রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে বাহিরচর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট হার্ডিং ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এসময় ২০-২৫ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়, দু’টি বালু ব্যবসায়ীর অফিসে ও একটি ড্রাম ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পদ্মা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে দেশের সর্ববৃহৎ রেলসেতু হার্ডিং ব্রিজ, বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্ট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পাবনা- কুষ্টিয়া মহাসড়কসহ আশপাশের হাজার হাজার একর জমি ক্ষতির মুখে রয়েছে, নদীভাঙনও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সোমবার (২ মার্চ) সরেজমিনে পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় গেলে স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীরা জানান, এখানে অবৈধ ফিলিং বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা চলছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, রবিবার গভীর রাতে একটি পক্ষ অবৈধভাবে বালু তুলছিল—এ খবর পেয়ে আরেকটি পক্ষ গুলি করতে করতে সেখানে গিয়ে হামলা চালায়, অফিসে আগুন দেয় এবং গাড়ি ভাঙচুর করে।
বালু ব্যবসায়ী শহিদুল জানান, গোলাগুলির পর তাঁর অফিসে আগুন দেওয়া হয় এবং তাঁর চাচাতো ভাই ফারুকের সুজুকি মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। আরেক ব্যবসায়ী লিটন প্রামাণিক বলেন, তাঁর অফিসও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; যে দল ক্ষমতায় আসে, তার ছত্রচ্ছায়াতেই মূলত অবৈধ বালু উত্তোলন চলে—এটাই বাস্তবতা বলে তিনি দাবি করেন। পুড়ে যাওয়া ড্রাম ট্রাকের মালিক পাকশীর বাসিন্দা মাজিদুল হক জানান, তাঁর গাড়ি মাঝেমধ্যে এখান থেকে বালু পরিবহন করত এবং সাম্প্রতিক ঘটনায় তাঁর প্রায় ৮ু১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এর আগে রবিবারই অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ভেড়ামারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ডা. গাজী আশিক বাহার নদী থেকে বালু তোলা অবস্থায় একটি ড্রাম ট্রাককে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও এক ব্যক্তিকে কারাদন্ড দেন। তিনি বলেন, অভিযানের কিছুক্ষণ পরেই আবার অবৈধ বালু উত্তোলন শুরু হয়, এরপরই রাতের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তাঁর ভাষায়, যেখানে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে, ঠিক সেখান থেকে ৪০০ মিটারের মধ্যে হার্ডিং ব্রিজ, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র এবং পাশেই পাবনা-কুষ্টিয়া মহাসড়ক রয়েছে; এসব কারণে এবং নদীভাঙন ঠেকাতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একটি বিশেষ সূত্র জানায়, বিএনপির দুটি পক্ষ এবং জামায়াতের নাম ভাঙিয়ে আরেকটি পক্ষ মিলে এই বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে; লভ্যাংশ ভাগাভাগি নিয়ে তাঁদের মধ্যে সমঝোতাও হয়েছে। তবে নদী-বাহিনী ও স্থানীয় আরও কিছু প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় মূলত গোলাগুলি ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সূত্র আরও জানায়, ৫ আগস্টের আগে-পরে নিয়মিতভাবেই এখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হয়; অভিযান শুরু হলে সাময়িক বন্ধ থাকে, আবার অদৃশ্য কারণে সচল হয়।
ভেড়ামারা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম আলম ও সদস্য সচিব শাহজাহান আলী জানান, বালু উত্তোলনের সঙ্গে বিএনপির কোনো সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে বিভিন্নভাবে অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছে, যা প্রতিকার করা জরুরি। কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের জামায়াতে ইসলামী এমপি আব্দুল গফুর বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না, জামায়াতের কেউ এতে জড়িত থাকলে তাও মেনে নেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, পূর্বে যারা এসব অবৈধ বালু ব্যবসায় জড়িত ছিল, এখনও মূলত তারাই সক্রিয়। নদীভাঙন ও হার্ডিং ব্রিজ-রূপপুর প্রকল্পের ক্ষতি এড়াতে বর্তমানে এ অঞ্চলের চারটি বালুঘাট বন্ধ রাখতে উপজেলা প্রশাসনকে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন