ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে সংস্কারের হাওয়া লাগলেও ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় এখনো বহাল তবিয়তে আছেন পতিত স্বৈরাচারের দোসররা। দেশজুড়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হলেও কাঁঠালিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কে.এম. জামান রয়ে গেছেন সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ উঠেছে, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলের মতোই তিনি এখনো সরকারি দপ্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজের অতীত অপরাধ ঢাকতে রাতারাতি খোলস পাল্টে স্থানীয় কয়েকজন সুবিধাবাদী বিএনপি নেতাকে ‘ম্যানেজ’ করে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। এই ঘটনায় স্থানীয় জনতা ও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে।
ছাত্র আন্দোলনের ওপর লাঠিচার্জ ও আওয়ামী প্রীতি
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিগত জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়, তখন এই শিক্ষা কর্মকর্তা কে এম জামান সিভিল প্রশাসনের কর্মচারী হয়েও ফ্যাসিবাদের পক্ষে সরাসরি মাঠে নামেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের সাথে যোগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও হামলায় সশরীরে অংশ নেন তিনি। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ায় তৎকালীন সময়েও সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল।
ভোট ডাকাতির দোসর ও দুর্নীতির মহোৎসব
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু ছাত্র আন্দোলন দমনই নয়, আওয়ামী শাসনামলে কাঁঠালিয়া শিক্ষা দপ্তরকে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলেন কে.এম. জামান। দলীয় ক্ষমতার প্রভাবে গড়ে তুলেছিলেন একক আধিপত্য ও ত্রাসের রাজত্ব। বিগত প্রহসনের নির্বাচনগুলোতে ভোট ডাকাতির নীলনকশা বাস্তবায়নে প্রশাসনের ভেতর থেকে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা আরও কিছু গুরুতর দুর্নীতির খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের বরাদ্দ লোপাট: প্রতিবছর সরকারি নির্দেশনায় ও সরকারি অর্থায়নে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ পালনের নিয়ম রয়েছে, যার জন্য প্রতি উপজেলায় ২১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কে.এম. জামান কোনো প্রকার অনুষ্ঠান না করেই সরকারি সেই পুরো টাকাটাই পকেটস্থ করেছেন।
ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রহসন: উপজেলা আন্তঃপ্রাথমিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণের জন্য আসা সরকারি বড় অঙ্কের বাজেট গায়েব করে দিয়েছেন তিনি। নামমাত্র কয়েকটি সস্তা প্লেট বিতরণ করে দায়সারা আয়োজন দেখিয়েছেন, যার বাকি অর্থ পুরোটাই আত্মসাৎ করা হয়েছে।
উন্নীত স্কেলের টাকা থেকে ৫% ‘কমিশন’ বাণিজ্য: ভুক্তভোগী একাধিক প্রধান শিক্ষক ক্ষোভের সাথে জানান, “আমাদের উন্নীত স্কেলের এককালীন অর্থ বরাদ্দ আসার পর শিক্ষা অফিসার জামান সরাসরি শতকরা ৫ টাকা হারে (৫%) কমিশন দাবি করেন। প্রথমে আমরা এই অনৈতিক দাবিতে রাজি না হলেও, পরবর্তীতে এই কর্মকর্তার প্রশাসনিক হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে তার ঘুষের দাবি পূরণ করেই টাকা উত্তোলন করতে হয়েছে।”
ভুয়া সংস্কার ও অর্থের বিনিময়ে ছুটি: বিদ্যালয়ের নামে আসা সরকারি সংস্কার বাজেট থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে নিম্নমানের কাজকে বৈধতা দেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া মোটা অঙ্কের মাসোহায়ার বিনিময়ে কতিপয় শিক্ষিকাকে বছরের পর বছর মৌখিকভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার (ভুয়া ছুটি) সুযোগ করে দিয়ে সরকারি কোষাগার লুণ্ঠন করছেন তিনি।
অফিসে অনুপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তিনি দিনের পর দিন সময়মতো অফিসে আসেন না। অথচ বিগত সরকারের সময়ে প্রশাসনের চেয়ারে বসে প্রকাশ্যেই বিরোধী মতাদর্শী বিশেষ করে বিএনপি সমর্থিত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেন এবং তাদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দিয়ে নানা বানোয়াট ও হয়রানিমূলক প্রতিবেদন তৈরি করতেন।
দায় এড়ানোর চেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ছাত্রদের ওপর হামলা এবং দুর্নীতির পাহাড়ের মতো এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কে.এম. জামান স্বভাবসুলভভাবে সবকিছু অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছেন তার কোনো ভিত্তি নেই। আমি কোনো প্রকার অনিয়ম, দুর্নীতি বা কারো ওপর হামলার সাথে জড়িত নই।”
অন্যদিকে ঝালকাঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “কাঁঠালিয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনিয়মের বিষয়টি মৌখিকভাবে আমার কান পর্যন্ত এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। ছাত্রদের ওপর হামলার মতো গুরুতর অভিযোগ ও দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলেই তদন্ত কমিটি গঠন করে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ক্ষুব্ধ কাঁঠালিয়াবাসীর আলটিমেটাম
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী এবং এমন একজন দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিবাদের দোসর কীভাবে এখনো পদে বহাল থাকে—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কাঁঠালিয়ার সচেতন মহল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও প্রাথমিক শিক্ষকরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত কর্মকর্তাকে অপসারণ করে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সুষ্ঠু তদন্ত এবং তাকে দ্রুত গ্রেফতারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।